প্রতিশোধ
বাবলু আহির
এবার কী হবে রে? -জামগাছের ডালে বসে গৌতম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল আমাকে।
হবেটা আর কী, প্রাণে তো আর মারবে না। সামান্য একটা টায়ারের জন্য যদি প্রাণ যায় যাবে।
ভয়ে মুষড়ে গিয়ে গৌতম কাছে সরে এসে বলল, জামগুলো বড্ড কষা! খিদে পাচ্ছে রে,চল বাড়ি যাই।
সব্বনাশ! বাড়ি? তোর কি মাথা খারাপ হলো? এখন বাড়ি গেলে দুজনের আস্ত থাকবে না!তার চেয়ে যেমন বসে আছিস থাক, খিদে পেলে জাম খা।
একটু নুন হলে ভালো হতো!মুখ বাঁকিয়ে গৌতম বলে উঠলো।
মুলেই খাঁদির বে হয়নি তায় আবার ঢাকঢোল!চোখ বন্ধ করে গিলে দে। সন্ধ্যা নামুক, গুটিগুটি বাড়ি যাবো, যেন কেউ টের না পায়।
গৌতম। পাড়ার ছেলে বুড়ো সকলে গৌতা বলে ডাকে। বেচারি এমন ফ্যাসাদে পড়েনি কখনো।
গাছ থেকে নামতে নামতে আমি বললাম, তবে নেমে পড়, আমরা নতুন পুকুরে।
পাড়ের ঝোপে ছোট ছোট বেশকিছু বেলগাছ ছিল। গৌতম বেলের পাতা ছিঁড়ে চিবোতে লাগলো। শ্রীঘ্রই নীল জিভ সবুজে পরিণত হলো।
বেলের পাতা চিবোতে চিবোতে গৌতম বলল, আচ্ছা তোর খিদে পায়নি?
তোর কি পেট নাই? তুই খিদে চাপিস কী করে জানিনা। তবে একরকম ভালো-মুচকি হাসে গৌতম।
হ্যা রে গৌতা, আমরা যদি ভালো মানুষের মতো সকলের চোখের সামনে দিয়ে বাড়ি যাই?
পেঁদিয়ে গতর ফেলে দিবে!
আরে, জানবে কী করে যে আমরাই করেছি?
হাসালি রে, আমরা এতক্ষণ ঘরে নাই,সকলে ভেবেই নিয়েছে যে কাজটা আমাদের।
হারামি ড্রাইভারটা কি ভালো!একটু যদি চাপতেই দিত তবে কি শালার ট্রাক্টরটা ক্ষয়ে যেত! এখন বুঝুক ঠ্যালা,শালা টের পেয়েছে ভালোরকম!
গৌতম গলা উঁচু করল তারপর বলল,তুই বা হঠাৎ প্রতিশোধের কথা ভাবতে গেলি ক্যানে? এখন বাড়ি যেয়ে হয়তো শুনব বাবা মায়ের ঘাড় ধরে টায়ারের দাম নিচ্ছে।আর তুই বল, এতো টাকা চাট্টিখানি কথা! তোর কথাটা আলাদা। তোর মামা পার্টি করে।বড় বড় লোকের সঙ্গে উঠাবসা। তোকে তো এমনিতেই ছেড়ে দিবে!
বেশ বুঝতে পারছি গৌতমের ভয়টা অন্যরকম, আমার থেকে আলাদা। আমি শুধু ভাবছি,মামার মাথাটা সবার সামনে নিচু হয়ে যাবে। ভাগ্নের দোষ মামার উপর পড়বে।
গৌতম হঠাৎ বলে উঠল, আমরা এখন বলির পাঁঠা! বেলপাতা খেয়ে নে, তারপর হাড়িকাঠ !
বেরালের ভাগ্যে সিকা ছিঁড়লেও তো ছিঁড়তে পারে?
ছিঁড়বে না রে, ছিঁড়বে না! কেঁদে কেঁদে মরে গেলেও ছিঁড়বে না!--গৌতম কেঁদে ফেললো।
এর জন্য দায়ী আমি।হ্যা, এই অপরাধের জন্য আমিই দায়ী।
আজ সকাল থেকেই বামুন পাড়ার মৃদুলদের পাকা বাড়ির জন্য বালি বইছিল একটা ট্রাক্টর। রাস্তা তেমন একটা ভালো নয় তাই ট্রাক্টরটি আস্তে আস্তে চলছিল। আমি আর গৌতম ট্রাক্টরের পিছু নিলাম।ঝুলে ডালাটায় উঠতে চেষ্টা করছিলাম। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে কড়া করে বকে দিয়ে চলে গেল।আমারো মাথা গেল বিগড়ে।
গোপীদের বাড়ির কাঠামো চলছিল। পেরেকের অভাব ছিল না। একখণ্ড পাটা আর পেরেক দুটো নিয়ে এলাম।পেরেক গাঁথা পাটাকে রাস্তায় রেখে ধূলো ঢাকা দিয়ে দিলাম। পেরেকের আগাগুলো ছিল উপর দিকে।
রাস্তার পাশে প্রাইমারী স্কুল।তার ছাদে উঠে অপেক্ষায় রইলাম কখন ট্রাক্টর আসবে। তাই মাঝে মাঝে মাথা তুলে দেখে নিচ্ছিলাম।
গৌতা, আসছে রে, শুয়ে পড়!
যেই না ধূলো বালি ঢাকা পেরেকের উপর দিয়ে চাকা গেছে পেরেকশুদ্ধ পাটা সেঁটে গেল চাকায়।ঘড় ঘড় ঘড় শব্দ! বুঝতে বাকি রইলো না আমাদের। সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের পিছন দিকে ধানের জমিতে লাফ!ধান জমির মধ্যে দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে নতুন পুকুর সেখান থেকে ভ্রমরার পুকুরের জাম গাছের ডালে।আর ওদিকে হইহট্টগোল বেঁধে গেল।
তখন থেকে দুজনে বিকাল পর্যন্ত লুকিয়ে বেড়াচ্ছি। সূর্যের আলো নিভে আসতেই দুজনে বেরিয়ে পড়লাম ঝোপ থেকে। ততক্ষণে সব শান্ত হয়েছে ঠিকই কিন্তু আমাদের খোঁজে চলছে তল্লাশি। আমি চুপি চুপি দিদিমার কাছে বসতেই বড়মামা এসে ধমক দিতে লাগল।
তোর জন্য মাথাটা আমার নিচু হয়ে গেল! তুই কি আমায় শান্তি দিবি না? কেন করলি একাজ?
ড্রাইভার বকে ছিল তাই…
তাই?কত টাকা ক্ষতি হয়েছে জানিস?
তারপর রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন সকাল আটটা। হয়তো আরো কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকা যেত কিন্তু বাইরে একটা গরুর একটানা প্রচণ্ড হাম্বা রবে অতিষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত বিছানা আমাকে ছাড়তেই হলো।চোখ ঘষতে ঘষতে বাইরে এলাম।একি!এ কী দেখছি আমি! আমাদের উঠোনের এক কোণে বাঁধা আছে গৌতমের সেই আদুরে গাইটি।একটু দূরে বাঁধা আছে মাত্র এক মাস বয়সের বাছুরটি। এই গাইটি ছিল গৌতমের আপনজনের মতো। বাছুর হওয়ার পর তো গৌতম খেলাধূলাও অনেক কমিয়ে দিয়েছিল।বাছুরটিকে নিয়ে তার অনেকটা সময় কেটে যেত। কিন্তু গৌতমের সেই প্রিয় জিনিস আমাদের এখানে কেন?মামা কোথাও বাইরে বেরিয়েছিলেন, বাড়িতে ঢুকতেই মামাকে জিজ্ঞেস করলাম,মামা,গৌতমদের গরুটা আমাদের এখানে কেন?
গতকাল রাতে ওরা আমাদেরকে গরুটা বিক্রি করে দিয়েছে।
কেন?
গতকাল তোদের সেই কুকর্মের জন্য বিচার বসেছিল।তাতে গৌতমের বাবাকে জরিমানা দিতে হয়েছে।আর জরিমানার টাকা জোগাড় করার জন্যই ওরা গরুটা আমাদেরকে বিক্রি করে দিয়েছে।
গতকাল রাতে এতোকিছু ঘটে গেল অথচ আমি কিছুই জানতে পারলাম না।
কী করে জানবি তখন তো অনেক রাত। আর হ্যা, তুই একবার গৌতমকে দেখে আয়।ওর শরীরটা ভালো নেই, গতকাল খুব মারধর খেয়েছে কিনা।
আমি একবার গরুটার দিকে তাকালাম একবার মামার দিকে। তারপর চারপাশ কেমন ঝাপসা হয়ে গেল।