লকডাউনে লটকে আছি-২
বাবলু আহির
বলি, সারাদিন তো ঘরেই আছো রাত না জাগলেই নয়?
পাশফিরেই গিন্নির উপদেশ।
কবিতা দিনের বেলায় আসে না তো।
এ্যাঁ,কী বললে?কে আসে না?বলি,বয়স বাড়ছে না কমছে?
এই মরেছে,এ যে দেখছি কই মাছের মত উজানে ছুটছে।
বলি, তুমি যা ভাবছো তা নয়। কবিতা মানে কবিতা,মানে ভাবনারা শব্দ খুঁজে পেলে যা বেরিয়ে আসে।
তা দিনের আলোয় বুঝি কবিতারা দিবানিদ্রা দেয়?
না না,তা কেন? ওদের আসার কি কোনো সময় আছে?
তাহলে ঘুম কামাই না করে ঘুমোও না বাপু! যতসব!
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর,অতএব জোরপূর্বক নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন।
এদিকে নববর্ষের আগমন। ছাব্বিশ ছেড়ে সাতাশে পা। এই বয়সটা খুব সুবিধার নয়।তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এই বয়সেই তো আমি পা হড়কে খাদে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস সেখানে ঝর্ণা ছিল তাই রক্ষে।ও বলতে ভুলে গেছি, সেই ঝর্ণাতেই আমি আটকে গেছি। বুঝলেন না? ঝর্ণা হলো আমার বউয়ের নাম। দাম্পত্য জীবনের তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তার নতুন নামকরণ করেছি গিন্নি।তিন তিনটা বছর কম সময় নয়। প্রথম প্রথম ঝর্ণার ঝিরিঝিরি গান আর শীতলতায় প্রাণ জুড়িয়ে যেত। আর এখন? সবুজ গাছগাছালি, পাখিদের কলতান বড্ড মধুর লাগে। যেন স্বর্গীয় আবহ সঙ্গীত! হায়রে,'নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস/ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।'অজানাকে জানাই যে মনুর সন্তানদের ধর্ম। এই তো সেদিন পাশের বাড়ির বউদি,জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দিলেন কলগেট হাসি যেন মুক্তো ঝরছে! এই লকডাউনের বাজারে এমন সুন্দর হাসি তাও আবার ফ্রিতে,ভাবা যায়। দূরত্ব বজায় রাখুন।সাবান দিয়ে পরিষ্কার করুন। হাতের সাথে সাথে মনটাকেও। পারলে একবার ওয়েলিং করে নিন।
আর কতদিন লটকে থাকবো প্রভু?রোজ রোজ ওই লাউ ডাটা আর কুমড়ার ঝাল যে আর ভালো লাগেনা।দাড়ি গোঁফের যা অবস্থা! নিজেকে আর আয়নায় দেখতে পারছি না।বউ ভেংচি কাটছে।বলছে,সখ করে আবার দাড়ি রেখেছে, আগে তো বেশ রেজার দিয়ে কাটতে যেই দুটো কবিতা লিখেছে অমনি বাবুর ছাগলের মতো দাড়ি রাখার সখ হয়েছে!
তা আমার দাড়ি আমি কাটবো নাকি ছাতিতে ঝোলাবো সেটা একান্তই ব্যক্তিগত। তোমাদের মতো তো আস্ত একটা বিউটি পার্লার বানিয়ে ফেলিনি।
কী,কী কিনে দিয়েছো শুনি? মেলায় নিয়ে গেলে তো ডাক্তার বনে যাও।এটা খাবে না, শরীরের ক্ষতি হয়।ওটা কিনবে না ত্বকের ক্ষতি হয়। বেশি ভিড়ের ভেতর ঢুকবে না, লোকের ছোঁয়াচে রোগ থাকলে তোমারো হয়ে যেতে পারে।যেই বিয়ে হয়ে গেল তো উনি এমবিবিএস হয়ে গেলেন। যতসব!
বুঝতে পারছি, চৈত্র মাসের শেষ। তাপমাত্রা তরতরিয়ে বাড়ছে।
বলি, চৈত্র সেল তো বন্ধ,কী হবে এবার?
কী আর হবে,পুজো তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।সুদাসল চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। হুম্, মনে থাকে যেন।
হে ভগবান, দরজা খুলে দাও, দড়ি কিনতে যাবো!
কিছু বললে?
হে হে,কই নাতো, কিছু না। ভাবছি,লকডাউন আর কতটা ডাউন হবে বলতে পারো?
কেন?ভালোই তো আছো,বই পড়ছো আর কবিতা লিখছো। আমাদের হয়েছে যত জ্বালা! এই লকডাউনেও হাতপুড়িয়ে রান্না! এই রান্নাঘরে যে কবে লকডাউন হবে! এই শোনো, লকডাউন উঠলেই আমি বাপের বাড়ি যাবো।
তা আর বলতে, এই একটা কুম্ফুই তো ভালো পারো। বলি, আমি কি একা এখানে কিতকিত খেলবো?
দুতিন দিনের তো ব্যাপার,একটু কষ্ট করে চালিয়ে নিও, সোনা আমার।
এখন তো আমি কাঁসা পিতল, ব্যাকডেটেড!
ঠিক আছে যেতে পারো একটা শর্তে।
বাব্বা! আবার শর্ত,কী শর্ত শুনি?
বলছি, লকডাউন তো আগে উঠুক।আর গেলেও স্রেফ দুদিন।
যাবো না।
কেন?
হুম্, আমি চলে গেলেই তো তোমার সুযোগ, বোতলনাচ নাচতে হবে না!
সেটা আবার কী?
কচি খোকা! এই পুতুল নাচই বরং ভালো।শোনো, লাউ ডাটা আর আলুগুলো একটু কেটে দাও।
ও আমি কাটতে পারবো না।
জল তো আনতে পারবে?যাও দুবালতি জল ভরে আনো।
দু'হাতে দুটো বালতি নিয়ে ট্যাপের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। কেমন যেন অস্থির লাগছে। কবিতা আসবে বোধহয়।
লকডাউনে লটকে আছি
জল আনি আর কাপড় কাচি।