প্রদীপের দৃষ্টি
বাবলু আহির
গ্রামের নাম মধুপুর।শহর থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরের এক সাধারণ গ্রাম। গ্রামের বেশিরভাগই খেতমজুর আর চাষি। গ্রামের মাঝখানে একটি প্রাচীন প্রাইমারী স্কুল। ঠিক তার পাশেই শিশুদের জন্য একটি আইসিডিএস স্কুল। সারা গ্রামের সব শিশু না আসলেও বেশ কিছু শিশু রোজ আসে এখানে। কেউ আসে ঠাকুরমার হাত ধরে তো কেউ আসে মায়ের সাথে। স্কুলের দিদিমণির বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ। অবিবাহিত। পাশের গ্রাম থেকে আসেন।যিনি রান্না করেন তিনি গ্রামের। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।রোজ কারো না কারোর সাথে বাকযুদ্ধে লিপ্ত থাকতে ভালোবাসেন।
গ্রামের শেষ প্রান্তে বাগাল পাড়া।পাড়ার সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। সকালের মেলা কাজ ফেলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে যাওয়াটা তাদের কাছে বিলাসিতার মতো।এই পাড়ার একমাত্র শিক্ষিত ছেলে পিন্টু। অনেক দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে আজ সে স্নাতক। বেকার যুবক।বিয়ে করেছে প্রায় সাত বছর হলো। কিছু টিউশন করে আর স্বপ্ন দেখে ছেলে দারিদ্র্যের ছোঁয়া থেকে দূরে রাখবে।মস্ত মানুষ তৈরি করবে। তাই ছেলের বয়স পাঁচ না হতে হতেই ভর্তি করে শহরের স্কুলে।রোজ গাড়ি আসে তাকে নিয়ে যায়। না, কোনো জোরজুলুম সে করে না ছেলের উপর। ছোট্ট সংসার। বেশ হাসি খুশিতে কেটে যায় দিন।
ছেলেকে নিয়ে প্রথম ক'দিন শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছিল। কিন্তু দিদিমণির উদাসীনতা পিন্টুকে হতাশ করে। পিন্টুর ছেলে প্রদীপ এখন পাঁচ বছরে পড়েছে।
পিন্টু গত পরশু দিন পাশের গ্রামে উপসাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়েছিল ছেলের পাঁচ বছর বয়সের একটা টীকা করণের জন্য। স্বাস্থ্য কর্মীরা তো অবাক। ছেলের বয়স অনুযায়ী বৃদ্ধি কম। বেশ কিছু কথাও শুনিয়ে দেয় পিন্টুকে। সাথে পরামর্শ দেয় আগামী পরশু গ্রামের শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ডাক্তার বাবু আসবেন সেখানে ছেলেকে নিয়ে যেতে।
আজ সেই দিন। সকাল আটটা। পিন্টু ছেলেকে নিয়ে শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে যায়। গিয়ে শুনে ডাক্তার বাবু নাকি গতকাল এসেছিলেন।ছেলে প্রদীপ তাকিয়ে থাকে রান্না ঘরে খিচুড়ি, ডিম আর কলার দিকে। স্কুল ছুটি। ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে লাইনে।একে একে সবাই খাবার নিয়ে চলে যায়। পিন্টু তখনও দাঁড়িয়ে থাকে। দিদিমণি উদাসীন। প্রদীপ স্কুলে আসেনি তাই তার রাগ। প্রদীপ কিন্তু স্থির ভাবে খাবারের দিকে তাকিয়ে। যদিও বাড়িতে পিন্টু তার খাবারের কমতি রাখে না।দুধ, ডিম,মাছ, মাংস,বেবি ফুড আবার বাজারে গেলেই নিয়ে আসে কলা, পেঁপে, আপেল,আঙুর ইত্যাদি। প্রদীপের প্রধান সমস্যা হলো সে কিছুতেই খাবে না। অল্প কিছু মুখে দিয়েই খেলতে ছুটে। তার খেলায় খুব নেশা। শরীরের পুষ্টি থাকে অধরা। চিকিৎসা যে হয় না তা নয়। আসলে বাবার দারিদ্র্য পীড়িত রুগ্ন শরীরের রক্ত তো তাই বোধহয় প্রদীপের এই দশা।তা যাই হোক, বাবার হাত ধরে প্রদীপ সেই খিচুড়ি, ডিম আর কলার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে,পিন্টু ভাবলো যদি দিদিমণিকে বলে একটা কিছু ম্যানেজ করা যায়। তাই সাহস করে দিদিমণিকে বলে, দিদি, ছেলের হাতে একটা কিছু দিন না।
দিদিমণি বললেন,সময় মতো প্রেজেন্ট না থাকলে কিছু দেওয়া যাবে না। তাছাড়া,ও তো আজ স্কুলে আসেনি। আমি কিছু দিতে পারব না।
এই কথা বলে, দিদিমণি আর রাঁধুনি বাড়তি খাবার গুলো ভাগাভাগি করে নেয়। প্রদীপ তখনও সেই দিকে তাকিয়ে আছে । মুহূর্তেই পিন্টুর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। অতীত শৈশব স্মৃতি তাকে কাঁদিয়ে দিল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন