সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০২২

লুকোচুরি

লুকোচুরি

বাবলু আহির

পৌষের শেষ সপ্তাহ তখন গতি পেয়েছে খুব
সেই হুহু করে ছুটতে থাকা দিনগুলোর
একটা মিষ্টি সকাল, আমাকে চিনতে পেরে
টেনে নিয়ে গেল
বাড়ির সামনে
আমার নিজের হাতে লাগানো
হলদে পাপড়ির আদুরে গাঁদাগুলোর মাঝে।

সোনা রোদ গায়ে মাখতে মাখতে
গল্পগুলো বেশ জমে উঠেছিল
উত্তুরে মৃদু হাওয়ার তালে।
এই তো সেদিন, ছোট্ট ছোট্ট চারা
জল-কাদায় খেলতে খেলতে--
শৈশবের সীমা পেরিয়ে গেল,
পৌঁছে গেল যৌবনের মেলায়!
এখন ওরা দিনভর--
রুক্ষ শীতের শীতল শিরায় উষ্ণতা ছোটায়।

একটু খানি আগেও
মনটা ভারি উদাস ছিল।
মেয়ে হারানো মায়ের প্রশ্নে
আঁধার আমাকে ঘিরে 
অট্টহাস্য জুড়েছিল!
আজ থেকে নয় বছর আগে-
মেয়েটা, তার মাকে কাঁদিয়ে, চলে গেছে--
 না ফেরার দেশে!
আমি, এখনো সেই ফ্রক পরা, ফুটফুটে পরীটাকে দেখি--
যখন তখন খিলখিল করে হাসে,
গান করে আপন মনে,
মায়ের সাথে চুল আঁচড়ায়, বিকেলের রোদে।
কখনো বা মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে
কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে
আমার কাছে,
চোখ মুছিয়ে দিয়ে আদর করলেই
বলে ওঠে,দাদামণি, মাকে আজ আচ্ছা মতো বকে দিও।
আমি বলি, ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে।

আজ সকালে,ওর মা এসেছিল,
হাতে একটা প্লাস্টিকের কার্ড
আমার হাতে দিয়ে জানতে চাইল--
আচ্ছা বাবু,এটা কি এখনো চালু আছে?
আমার তো কিডনিতে পাথর হয়েছে
তাই, হাসপাতালের ডাক্তার বাবু বললেন--
স্বাস্থ্যবীমা কার্ডটা নিয়ে যেতে।

কার্ডে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম
এটা তো সেই ফ্রক পরা, ফুটফুটে মেয়েটার কার্ড!
একবার মায়ের মুখের দিকে
একবার কার্ডের দিকে তাকিয়ে
কী জবাব দেব কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।
বারবার কেবল মনে হতে লাগলো
এই অসুস্থ শরীরে তাকে, মেয়ের কথা বলে
নাই বা দুঃখ দিলাম।

অনেকক্ষণ ইতস্তত করে
বললাম, কাকিমা, এই কার্ডে তো কিছু হবে না
ডেট ফেল হয়ে গেছে অনেক আগেই।

না, মায়ের মুখে কোনো হতাশার ছায়া নেই,
কার্ডটা নিয়ে বাড়ি মুখো ওই মায়ের দিকে
অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম
চারদিকে কেমন যেন গাঢ় কুয়াশা
ছলছল করে উঠলো চোখ
মোচড় দিয়ে উঠলো বুকটা!

এখন এই গাঁদাফুলের মাঝে
সেই ফ্রক পরা, ফুটফুটে পরীটা
আমার সাথে, রোদের সাথে লুকোচুরি খেলছে,
আমি বারবার হেরে যাচ্ছি,
এখন যে আমার খুব হারতে ইচ্ছে করছে।


22শে ফাল্গুন,১৪২৫
মেদিনীপুর








কোন মন্তব্য নেই: